রাত ১২:৩৩, মঙ্গলবার, ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ১১ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী
BREAKING NEWS
Search

ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা আর অহিংসার হাত ধরেই চলছে সহিংসতা আর সাম্প্রদায়িকতা

32

বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি শব্দগুলি শুনতে বেশ লাগে। আরো ভাল লাগে তা উচ্চারণ করতে। কারণ ‘ভারতীয় ঐতিহ্য’র সঙ্গে শব্দগুলি নাকি ওতপ্রোত জড়িত।

এবং দেখছি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় সেই ‘ঐতিহ্য’র কথাই দেশের জনসাধারণ ও দেশের শাসকদের সম্প্রতি বার বার যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

এই কারণে কি যে, দেশের শাসকগণ ও দেশবাসী এখন সেই ‘ঐতিহ্য’র প্রতি খানিক পরাঙ্মুখ?

কিন্তু আমার তো মনে হয় ‌ওই ভাল লাগা শব্দগুলির সঙ্গে একেবারে হাত ধরাধরি করেই চলেছে সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা, অস্পৃশ্যতা, পরমত অসহিষ্ণুতা (সে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক যাই হোক) ইত্যাদির মতো মন্দ শব্দগুলিও। যাদের অস্বীকার করবার জো নেই। যাদের কোনো নৈর্ব্যক্তিক উদাসীনতায় এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই ।

বিভিন্ন রাজ্যে জাতপাতের কুৎসিত সংঘাত, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও অস্পৃশ্যতার এমন সব মর্মান্তিক বহিঃপ্রকাশ ঘটছে যে, নিজেকে এই দেশের নাগরিক ভাবতেও লজ্জা বোধ হচ্ছে।

এবং দেশের নানা প্রান্তে সংঘটিত সেই সব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলেও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বোধহয় এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, আবহমান কাল ধরে সেইসব দুর্বিনীত আচরণের ঐতিহ্যকে ভারতীয় সমাজই লালন করে চলেছে।

তাই দেশের জিডিপি যতই বাড়ুক, প্রযুক্তিতে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে দেশ যতই এগিয়ে চলুক, আমাদের সমাজে ওই মন্দ শব্দগুলির মৌরুসি পাট্টা আজও কেউ ভেঙে দিতে পারে নি।

কিন্তু মনে হয় সত্যি কি কেউ ভাঙতে চেয়েছে? তা না হলে এমন ঘটনা আজও ঘটছে?

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ছবির কপিরাইট 
 ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়: সবাইকে ‘ঐতিহ্য’র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

সম্প্রতি তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলায় একটি মন্দিরের সামনে তিন দলিত যুবক কয়েক জন উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিল। আর তাতেই সেই উচ্চ বর্ণীয়রা নাকি প্রচণ্ড ‘অপমানিত’ বোধ করে। এবং সেই অপমানের জ্বালা জুড়োতে এবং দলিতদের ওই ‘দুঃসাহস’ দেখানোর ‘অপরাধ’র শাস্তি দিতে তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রামে চড়াও হয়ে ওই তিন যুবককে হত্যা করে।

আর গুজরাটে তো দেখলাম ২১ বছরের এক দলিত তরুণ শুধু ঘোড়ার মালিক হওয়া এবং দুর্দান্ত ঘোড়সওয়ার হয়ে ওঠার অপরাধে উঁচু জাতের লোকদের হাতে নৃশংস ভাবে খুনই হয়ে গেল গত এপ্রিলে। কারণ ঘোড়ার মালিক হওয়া দলিতদের নাকি এক্তিয়ারের বাইরে।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত দলিত নির্যাতনের এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘটছে। এবং দেখছি উত্তরোত্তর তা বেড়েই চলেছে।

যেমন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’র ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উত্তর প্রদেশে মোট নথিভুক্ত অপরাধের মধ্যে ২৫.৬ শতাংশই সংঘটিত হয়েছিল দলিতদের বিরুদ্ধে। যা ছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিহার, রাজস্থান যথাক্রমে ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। এবং এতদিন যে ভাবা হত, জাতপাতের দ্বন্দ্ব, সহিংসতা শুধু গ্রামগঞ্জেই সীমাবদ্ধ, সেই ‘মিথ’ও ভেঙে দিয়েছে ওই রিপোর্টই । আসলে ট্র্যাডিশন অব্যাহত।

ভারতের প্রধান দুই দল ২০১৭ সালে গুজরাটে বিধান সভা নির্বাচনের সময় প্রচারণা চালাচ্ছে।ছবির কপিরাইট 
 ভারতে নির্বাচনী প্রচারণা: ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতাদের দলিত প্রেম জেগে ওঠে?

অবশ্য ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রীদের দলিত প্রেম জেগে ওঠে। কে আগে তাঁদের ঘরে গিয়ে একসঙ্গে পাত পাড়বেন, সেই লাইন পড়ে যায় দলিতদের কুঁড়ের সামনে।

রাতারাতি তাদের ঘরের মেঝে পাকা হয়ে যায়। তৈরি হয়ে যায় রাস্তাও।

তবে দুদিনের ওই দলিত প্রেমীদের প্রস্থান ঘটলেই দলিতরা দেখে, তারা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

এতদিনে তারা অবশ্য বুঝেও গেছে যে, ‘অস্পৃশ্যতা’র কলঙ্ক-বোঝাটি আমৃত্যু তাদের পিঠে বয়েই বেড়াতে হবে। এবং কেউ যদি তাদের নুয়ে পড়া পিঠ থেকে সেই অদৃশ্য বোঝাটি নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে তার পরিণতিও কে জানে হয়তো রোহিত ভেমুলার মতোই হবে।

হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি’র যে দলিত ছাত্রটি তার জাতিগত পরিচিতির বাইরে বেরুতে চেয়েছিল। কিন্তু সমাজ তাকে সেই সুযোগ দিতে চায় নি। দু’বছর আগে সে আত্মহত্যা করে।

তবে আমার কেবলই মনে হচ্ছে ভারতের বহুমাত্রিক সমাজে এই অস্পৃশ্যতার ঐতিহ্য কি এতোটাই দৃঢ়মূল যে তাকে উৎখাত করা যাচ্ছে না? অবশ্য হতাশাও জাগছে এই দেখে যে, তাকে জিইয়ে রাখতে ব্যক্তিগত, প্রতিষ্ঠানগত বা সামাজিক উদ্যোগেও কিছুমাত্র ভাঁটা পড়ছে না ।

আবার প্রায়ই দেখছি ভিন জাতে বা ভিন ধর্মে বিয়ে করলে বা বন্ধুত্ব করলে পরিবারই এগিয়ে এসে তাদের শাস্তি দিচ্ছে। এবং পারিবারিক সম্মান বাঁচানোর নামে নব দম্পতিকে সে নিজেদের ছেলে মেয়ে যেই হোক, খুন করে বসছে।

দেখছি জাতিসঙ্ঘের হিসেব বলছে, এই ‘অনার কিলিং’ সারা পৃথিবীতে যত হয়, তার প্রতি পাঁচটির একটিই না কি ঘটে ভারতে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’র পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে ২০১৪ – ২০১৫ এই এক বছরেই ভারতে ‘অনার কিলিং’ বেড়েছে ৭৯৬ শতাংশ।

আর এই সম্মান রক্ষার্থে হত্যা ঘটেছে গুজরাট, উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ – এই তিন রাজ্যে সব থেকে বেশি। অর্থাৎ স্বীকার করে নিতেই হচ্ছে যে, এই ‘অনার কিলিং’ও দেশের এক সনাতনী পরম্পরা যা, ভারতীয় সমাজে লালিত হচ্ছে বহু যুগ ধরে। যা সময়ের কালস্রোতে এতটুকুও ফিকে হয় যায় নি।

তাই আমার কেবলই মনে হচ্ছে, ভারতের বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা, অহিংসা ইত্যাদি মান্য শব্দগুলিকে কেবলই যেন ব্যঙ্গ করে চলেছে দেশের ওই ঘটমান অস্পৃশ্যতা, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা’রা।

ইদানীং আবার দেখছি ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির দিগন্তে মেরুকরণের এক কালো মেঘও যেন ঘনিয়ে উঠছে। তাতে নতুন করে আশঙ্কা জাগছে, আমাদের গণতন্ত্রও না এবার দুর্বল হয়ে পড়ে।১৭ জুলাই ২০১৮বিবিসি



sky television /স্কাই টিভি


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *