রাত ১২:১৩, মঙ্গলবার, ৬ই ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২০শে আগস্ট, ২০১৮ ইং, ৯ই জিলহজ্জ, ১৪৩৯ হিজরী
Search

নন ভিআইপি মুক্তিযোদ্ধাদের মরণোত্তর অপমান!

44

দ্বিতীয় রোজার সাহ্‌রি সেরে ফজরের নামাজের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চোখটা লেগে আসছিল। মোবাইল না বাজলে নামাজটাই ফসকে যেত—কাজার লাইন লম্বা হতো। কিন্তু এত সকালে কে? বড় অপরিচিত নম্বর থেকে একজন বলছেন, ‘আমি খুন্তাকাটার হামিদা বাওয়া!’ কত দিন যাওয়া হয় না বাগেরহাট, শরণখোলা, খোন্তাকাটা, বাধাল। দ‌ক্ষিণ বাধাল গ্রাম থেকে নিরুপায় হয়ে সাতসকালে ফোন করেছেন হামিদা বুবু। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কাজলের বিধবা। ভোররাতে কারা যেন তাঁদের আর তাঁর প্রতিবেশীদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। সব পুড়ে গেছে, প্রায় ২৬টি ঘর। হামিদা বুর আরজি, আমি যেন কিছু করি।

২০০৭ সালে সিডরের পর রায়েন্দা থেকে শরণখোলায় সব কটি ইউনিয়নে চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে একদিন বাধালে কাজল শেখের সঙ্গে দেখা। আমাদের কাজে তাঁর সহযোগিতা ছিল অকুণ্ঠ। অনেক পরে জেনেছিলাম, তিনি মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছিলেন। সুন্দরবনের মধ্যেই পুরো সময়টা কাটিয়েছিলেন। বরিশাল গোপালগঞ্জের মানুষদের নদীপথ দ‌ক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন একাত্তর সালে। রাজাকার, বাঘ, কুমির আর পাকিস্তানিদের গানবোটের ফাঁদ পেরিয়ে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না সে সময়।

সেই অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধার অসহায় স্ত্রীর ফোন। তাঁরা তখন খোলা আকাশের নিচে। একদিন পরে বিভিন্ন পত্রিকার ভেতরের পাতায় খুব ছোট করে খবরটি ছাপা হয়। ঘটনায় অনেক গিঁট কিন্তু ফাঁস একটাই। প্রা‌ন্তিক মানুষদের ভিটেছাড়া করার ফাঁস। হামিদা বুরা আগে গরিব, তারপর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। সব পরিচয়ের আগে এ দেশে বড় পরিচয় পেশির জোর কতটা, সয়সম্পত্তি কতটা। গরিবের কোনোটাই নেই। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।

বীর মুক্তিযোদ্ধাও যা পারেন না
মুক্তিযোদ্ধা শেখ কাজলের বিধবা স্ত্রী এবং তাঁর মতো মানুষেরা ২০০৭ সালের ঝড়ে শরণখোলার প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ ঘরবাড়ি হারায়। সাউথখালীর সবটুকুই ভেসে গেলেও ধানসাগর, রায়েন্দা, খোন্তাকাটা কোনো ইউনিয়নই সিডরের ছোবল এড়াতে পারেনি। শরণখোলার অনেক মানুষ বেড়িবাঁধে ঘর উঠিয়ে থাকতেন। এর প্রায় সবই ভূমিহীন প্রা‌ন্তিক শ্রেণির মানুষ। তাঁদের ঘরবাড়ি একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়। কথা ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আর দরিদ্র মানুষদের আগে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার। বেসরকারি সংস্থাগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে সে অনুযায়ী কাজ শুরু করলে বাগেরহাটের তখনকার প্রশাসক ঠিক করলেন, যাদের জমি আছে তারাই ঘর পাওয়ার হকদার। তাঁর ভাষায়, যারা অবৈধভাবে বেড়িবাঁধে এত দিন বসবাস করছে, তাদের উচ্ছেদ করায় সিডরকে ধন্যবাদ। আমরা আর জমি বেদখল হতে দেব না। এ না হলে স্বাধীন দেশের প্রশাসক! তদবির-দরবারের একপর্যায়ে ঠিক হয়, সম্ভব হলে খাসজমিতে তাদের ঘরবাড়ি করে দেওয়া হবে। বলা বাহুল্য আধা টন ঘিও জোটেনি রাধাও নাচেনি। প্রজেক্ট ফুরাল বলে ধন ফুরাল, পান ফুরাল বলে এনজিওরা পরের দুর্যোগের জন্য যার যার ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু সেই একাত্তরের সাহসী মানুষরা খাসজমির যুদ্ধটা চালিয়ে যান। দেশ উদ্ধারের যুদ্ধে তাঁরা নয় মাস সফল হলেও জমি উদ্ধারের যুদ্ধে কেটে যায় সাত বছর। গত ২০১৪ সালে দ‌ক্ষিণ বাধালের (খোন্তাকাটা ইউনিয়ন) এক টুকরা অর্পিত সম্পত্তিতে ঘর উঠিয়ে থাকার অনুমতি দেন তখনকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রতিবন্ধী, ভূমিহীন আর মুক্তিযোদ্ধাদের ১৫টি পরিবারকে এই বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। দেশ রক্ষা যত সহজ, জমি রক্ষা তত সহজ নয়। ভূমিখাদক প্রথমে মামলা, এরপর হামলা শেষে আগুন দিয়েছে তাঁদের বাড়িঘরে। প্রায় ২৬টি ঘর পুড়েছে সেই আগুনে। পুড়ে যাওয়ায় ঘরের মানুষরা এখন কাছের মন্দির আর গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কি মানববন্ধন করবেন, মোমবাতি হাতে দাঁড়াবেন রাস্তার পাশে? শহিদ মিনারে? শাহবাগে? কাজল শেখের বিধবাকে আমরা কী বলব? ইউএনও লিংকন বিশ্বাস ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশ্বাস আর আশ্বাসের ওপর মানুষের ভরসা আর কত দিন থাকবে?

স্বাধীনতার দান: চাটাইমোড়ো লাশ আর নর্দমার নাম
এসব নিয়ে যখন মন খারাপ, তখন আরেকটা করুণ খবর এলো পাবনার বেড়া থেকে। মুক্তিযোদ্ধা তাহেজ উদ্দিন সরকারের মরদেহের প্রতি প্রথা অনুযায়ী শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য গার্ড অব অনার দেওয়া হলেও রীতি মোতাবেক তাঁর মরদেহটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়নি। জুটেছিল শুধু বাঁশের চাটাই। আমাদের এখন মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রীও আছেন। শুধু নেই দেশের সূর্যসন্তানদের সবার জন্য সমান শ্রদ্ধা। বেড়ার সম্ভপুরা আর শরণখোলার বাধাল—কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নেই। ভিআইপি মুক্তিযোদ্ধা না হলে তাঁদের জন্য আগামী দিনে যদি বাঁশের চাটাইও না জোটে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কষ্টের কথা লিখে পাঠিয়ে দেওয়ার পর খবর এল পতাকার ব্যবস্থা করতে না পারার কারণ দর্শাতে সংশ্লিষ্ট ইউএনওকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আইন তার নিজের গতিতে চলবে; সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ভালো কথা, এসব নিয়ে আর লেখালেখি নয়। এসব মেনে নিয়ে নিজের চরকায় তেলের জায়গার ঢাকনা খুলতে না খুলতেই কলিজা জ্বালানো খবর এল বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মেহেরপুর থেকে। সেখানে এক নর্দমার নাম রাখা হয়েছে এক মুক্তিযোদ্ধার নামে, অশ্রদ্ধা আর অপমানের আর কোন সীমাটা বাকি থাকল? এসব সীমা লঙ্ঘনকারীদের নিয়ে হইচই করলে বড় জোর আরেকটা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হবে। আর আইন ভালো ছেলের মতো মুরুব্বির হাত ধরে চলবে।

তিনটি ঘটনাই সত্য। তবে একটি ছাড়া বাকি নামগুলো কাল্পনিক; নিরাপত্তার স্বার্থে আর ভোগান্তির ফাঁস এড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধেই আসল নাম ব্যবহৃত হলো না! কারণ, আমরা আজ নিদারুণ স্বাধীনতার মধ্যে আছি যে /!প্রথম আলো

গওহার নঈম ওয়ারা

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।



sky television /স্কাই টিভি


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *